নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সুশাসন

আইনের শাসন – Education BCS Preparation

একজন আইনের শিক্ষকের অসহায়তা
প্রথম আলো, ০৬ এপ্রিল ২০১৮
আসিফ নজরুল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক


নেপালে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছি। সেখানে এর আয়োজক সুজনের বদিউল আলম মজুমদারের সঙ্গে দেখা। পরদিন সুজনের আরেকটি অনুষ্ঠান প্রেসক্লাবে। বিষয় আইনের শাসন। আইনের শাসনের সঙ্গে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, উন্নয়নসহ বহু বিষয় জড়িত। তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, এসব নিয়ে কাজ করছে এমন সংগঠনগুলোকে এই আয়োজনের সঙ্গে রাখা যেত না? তিনি দুঃখের সঙ্গে জানালেন, তিনি চেষ্টা করেছিলেন। রাজি হয়নি তারা।

আইনের শাসন নিয়ে যদি সমাজের অনেকে কথা বলতে রাজি না হয়, তাহলে আমাদের বুঝতে হবে আইনের শাসনে মারাত্মক সমস্যা হচ্ছে দেশে। সুজনের সভায় গিয়ে বক্তাদের অনেকের কথায় তারই আভাস পেলাম। স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন আমার প্রিয় একজন মানুষ। তিনি বললেন, রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন উল্টো পথে চলে বহু ভিআইপির গাড়ি। এই আইন লঙ্ঘনই বন্ধ করা যায় না দেশে। তিনি ধানমন্ডির একটি খেলার মাঠ জনগণ যাতে ব্যবহার করতে পারে, সে জন্য আন্দোলন করেছিলেন। এ-সংক্রান্ত হাইকোর্টের পুরোনো একটি রায়ও আছে তাঁর অবস্থানের পক্ষে। হাইকোর্টের সেই রায় মানা হচ্ছে না। এর প্রতিকার তিনি হাইকোর্টেই চাইতে গিয়েছিলেন। অথচ এই আরজি শুনতে বিব্রতবোধ করেছে হাইকোর্টের কয়েকটি বেঞ্চ। মাঠ এখনো দখলে আইনের ঊর্ধ্বে থাকা মানুষের।

বেলার রিজওয়ানা হাসান তুললেন আইনের শাসনের আরও একটি অমীমাংসিত বিষয়। সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ করেছিল সরকার। তাঁর দুর্নীতির ফাইল দেখতে দেওয়া হয়েছিল তখনকার আপিল বিভাগের বিচারপতিদের। তাঁরা এটি দেখে সিনহার সঙ্গে একত্রে বিচারকার্যে বসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এসব পত্রিকায়ও প্রকাশিত হয়েছিল। রিজওয়ানার প্রশ্ন, দেশের সবচেয়ে সিনিয়র বিচারপতিরা এবং সরকার যে দুর্নীতি সম্পর্কে জানে, তার তদন্ত কোথায়? কারা কারা ছিল এই দুর্নীতির সঙ্গে? এত বড় দুর্নীতির অভিযোগের বিচার না হলে কোথায় থাকে আইনের শাসন?

দেশের সংবিধানপ্রণেতাদের অন্যতম প্রধান ড. কামাল হোসেন সুযোগ পেলেই আইনের শাসন রক্ষায় আদালতের ভূমিকার কথা গর্বের সঙ্গে বলেন। সেদিনও বললেন। কিন্তু তাঁর দেওয়া উদাহরণগুলো মূলত অতীত কালের। বর্তমান সময়ের কথা বলতে গিয়ে তিনিও একসময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। সাবেক প্রধান বিচারপতি স্বপদে বহাল থাকার সময় টেলিভিশনে তাঁকে কটুকাটব্য করা হয়েছে। তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, আইনের শাসন থাকলে এটা হতে পারে না সভ্য কোনো দেশে!

আইনের শাসন নিয়ে আরও বহু ধরনের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। এ ধরনের ক্ষোভ সাধারণ মানুষের মধ্যেও আছে বলে আমার বিশ্বাস। যে দেশে অসংখ্য মানুষ গুম হয় কিন্তু বিচার হয় না, ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা একসময়ের অভিযুক্ত গাড়িচোর বা ডিম বিক্রেতার হাতে তুলে দেওয়ার আসল কুশীলবেরা থাকেন বহাল তবিয়তে, শেয়ার মার্কেট লুটের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা বিচারের সম্মুখীন হন না, সরকারি দলের ক্যাডারদের ছবি পত্রিকায় ছাপা হওয়ার পরও পুলিশ তাদের চিনতে পারে না, সে দেশে এমন প্রশ্ন থাকা অস্বাভাবিক নয়।

আইনের শাসন আলোচনায় অবশ্য একটা বিষয় আমরা আলোচনায় তুলি কম। সেটি হচ্ছে আইনটা কার, কে প্রণয়ন করল, জনগণের সম্মতি আছে কি না তাতে। আমার মতে, এটিই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ দেশের জন্য।

২.
আইন তৈরি করতে পারেন সামরিক শাসক বা জোর করে ক্ষমতা দখল করা শাসকও। কিন্তু তাঁর শাসনকে আমরা আইনের শাসন বলতে পারি না। আইনের শাসনের প্রথম কথা হচ্ছে আইন প্রণীত হতে হবে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি দ্বারা। কাজেই সেই নির্বাচন অবশ্যই হতে হবে প্রকৃত নির্বাচন। প্রকৃত নির্বাচনে সবার প্রার্থী হওয়ার সুযোগ থাকবে এবং ছলে-বলে-কৌশলে কারও প্রার্থী হওয়ার সুযোগ কেড়ে নেওয়া হবে না। প্রকৃত নির্বাচনে প্রত্যেকে ভোট দিয়ে তাঁর প্রতিনিধি পছন্দ করার সুযোগ পাবেন এবং এর ফলাফল সঠিকভাবে ঘোষিত হবে।

এসব না হলে যাঁদের নির্বাচিত দেখানো হবে, তাঁরা জনগণের প্রতিনিধি হবেন না। এঁরা যদি দেশ চালান, আইন প্রণয়ন করেন এবং আইন কার্যকর করার ব্যবস্থা নেন, তাহলে তা কোনোভাবেই আইনের শাসন হতে পারে না। ১৯৬৬ সালে বৈশ্বিক যে চুক্তি হয়েছিল মানুষের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের ওপর, যার পক্ষরাষ্ট্র আমরাও, সেখানে তাই প্রকৃত নির্বাচনের (জেনুইন ইলেকশন) ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

আইনের শাসনের আরও মানদণ্ড রয়েছে। আইনটি হতে হবে জনকল্যাণকর, জনমুখী। এ জন্য শুধু নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সঙ্গে নয়, আইন করার আগে নাগরিকদের সংগঠনগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় করতে হবে। সবার মতের প্রতিফলন আইনে থাকতে হয়। আইনের শাসনের তৃতীয় মানদণ্ড হচ্ছে এটি প্রয়োগ হতে হবে পুরোপুরি বৈষম্যহীনভাবে, আদালত কাজ করবেন সম্পূর্ণ পক্ষপাতহীনভাবে।

বাংলাদেশে আইনের শাসনের গলদ এখন মূলে। গত নির্বাচনের পর জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে যাঁরা আইন প্রণয়ন করছেন, তাঁরা অনেকে আসলে জনগণের কতটা প্রতিনিধিত্ব করছেন, সেই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। আরও সমস্যা হচ্ছে এই প্রশ্নবিদ্ধ প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আইন প্রণয়নের সময় যথেষ্ট আলোচনা করে না সরকার। নাগরিক সমাজ ও পেশাজীবীদের সঙ্গে বসে কখনো কখনো তাঁদের কথা শোনা হলেও আইনে আর তাঁদের মতের প্রতিফলন খুঁজে পাওয়া যায় না। এনজিওদের নিয়ন্ত্রণমূলক, বাক্স্বাধীনতা খর্বমূলক ও ব্যাংকিং সেক্টরের জবাবদিহি খর্বমূলক আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে তা-ই হয়েছে।

দেশে আইন যা আছে, তা-ও প্রয়োগ হয় না ঠিকমতো। আইন সরকারি দলের লোকজনের জন্য এক রকম, অন্য দলের জন্য অন্য রকম। সরকারি দলের বা সরকারপক্ষের কেউ খুন হলে বা আক্রান্ত হলে সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা হয় গণগ্রেপ্তার। বিরোধী দলের কেউ খুন হলে আসামি খুঁজেই পায় না পুলিশ বছরের পর বছর। শুধু পুলিশ না, গোয়েন্দা, দুদক, এনবিআর বা অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস-আইনের প্রয়োগে তাদের আগ্রহও পরিবর্তন হয় দল ও পক্ষভেদে। অনেক সময় বিচার বিভাগে দেখা যায় সরকারের হস্তক্ষেপের আলামত। এগুলো আইনের শাসন নয়।

৩.
আমি সাংবিধানিক আইনের শিক্ষক। আইনের শাসনের কথা সবচেয়ে জোরালোভাবে বলা আছে সংবিধানে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে সবচেয়ে আগে কার্যকর করতে হয় সর্বোচ্চ আইন সংবিধানকে। অথচ অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে এ নিয়ে আজকাল ক্লাসে কথা বলতে গেলে ছাত্রছাত্রীরা বিষয়টি রসিকতার মতো ধরে নেয়।

আমি ছাত্রদের বলি: সংবিধানে আছে শুধু আইন দ্বারা শাসিত হবে দেশের প্রতিটি মানুষ এবং এর প্রয়োগ হবে বৈষম্যহীনভাবে। আমি তাদের বলি: পুলিশ কাউকে ধরামাত্র তাকে জানাতে হবে গ্রেপ্তারের কারণ। বলি: কোনো রকম পুলিশি অত্যাচার, নির্যাতন এমনকি অবমাননাকর ব্যবহার দেশের সংবিধানে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আমি তাদের বলি: বিচার করার ক্ষেত্রে বিচারকেরা স্বাধীন বাংলাদেশে, বলি আমাদের দেশকে পরিচালিত করতে হবে বৈষম্যহীনভাবে, দেশে রয়েছে সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। সংবিধানে আছে সরকারের কর্মকর্তারা হচ্ছে তোমাদের সেবক, হর্তাকর্তা নয়।

সংবিধানের এসব কথা শুনে ছাত্রছাত্রীরা তীব্র অবিশ্বাস নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। কেউ কেউ হাসে। আমি অসহায়ের মতো বলি: আমি শুধু আইনে কী আছে তা পড়াচ্ছি তোমাদের। বাস্তবে কী হচ্ছে, সেটা নিয়ে আমার তো কিছু করার নেই!

কিন্তু আমি জানি আইন যদি বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কহীন হয়ে পড়ে, পদে পদে যদি হয় এর ব্যত্যয়, তাহলে আইনের শাসন শুধু তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।

আমার আশঙ্কা, সেদিন দূরে নয় এ দেশে।

image_pdfDownload Pdfimage_printPrint Article
Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

18 + 1 =

Back to top button
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker