রফিক আজাদ এর কবিতা সংগ্রহ

রফিক আজাদ

কবি রফিক আজাদ – জন্মগ্রহণ করেন অবিভক্ত বাংলার টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল থানার গুণী গ্রামে।
পিতা সলিম উদ্দিন খান ছিলেন একজন প্রকৃত সমাজসেবক এবং মা রাবেয়া খান। তিন ভাই-দুই বোনের
মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ।

১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি স্কুলের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র থাকা কালীন, রফিক ভাষা শহীদদের স্বরণে বাবা-
মায়ের কঠিন শাসন অস্বীকার করে খালি পায়ে মিছিল করেন। ভাষার প্রতি এই ভালোবাসা পরবর্তী জীবনে
তাকে তৈরি করেছিল একজন কবি ও আদর্শ মানুষ হিসেবে। ১৯৫৬ সালে সপ্তম শ্রেণীরতে পড়ার সময়ে
একবার বাবার হাতে মার খেয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন বাড়ি থেকে, পি.সি সরকারের কাছে জাদু শিখবেন
বলে! ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ স্কুলের হেডমাস্টারমশায় তাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে বাড়িতে পাঠান। কৈশোরে
লাঠি খেলা ও শরীরচর্চাও। গুণী গ্রামের পাশেই ছিল মনিদহ গ্রাম। এখানকার ষাট শতাংশ অধিবাসী ছিল
নিম্নশ্রেণীর হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত। সুতার, ধোপা, দর্জি, চাষা ইত্যাদি। এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েরাই
ছিল রফিক আজাদের শৈশব ও কৈশোরের বন্ধু। সাধুটী মিডল ইংলিশ স্কুল থেকে অষ্টম শ্রেণী পাস করে
কবি ভর্তি হন কালিহাতি রামগতি শ্রীগোবিন্দ হাই ইংলিশ স্কুলের নবম শ্রেণীতে। বাড়ি থেকে প্রায় তিন-চার
মাইল দূরত্বে স্কুল। কালিহাতি সংলগ্ন গ্রাম হামিদপুরের এক দরিদ্র গৃহস্থের বাড়িতে পেইং গেস্ট হিসেবে
থেকে তিনি পড়াশোনা করেন। কালিহাতি হাই স্কুলে পড়ার সময় বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে সতীর্থ মাঈন উদ্দিন
আহমদের সঙ্গে। তিনি ছিলেন ক্লাসের ফার্স্ট বয় এবং অত্যন্ত মেধাবী। সাহিত্যপাঠে আগ্রহ ছিল তাঁর। এই
মাঈন উদ্দিনই রফিক আজাদের আড্ডার প্রথম গুরু। হামিদপুরে তার সঙ্গে শুরু হয় তুখোড় আড্ডা। তার
মুখেই প্রথম মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম শোনেন। দিবারাত্রির কাব্য, পুতুল নাচের ইতিকথা, পদ্মানদীর
মাঝি প্রভৃতি উপন্যাসের সঙ্গে পরিচিত হন। মাঈন উদ্দিন একদিন সন্ধ্যাবেলা ফটিকজানি নদীর তীর ঘেঁষা
ডাকবাংলোর বারান্দায় বসে রবীন্দ্রনাথের নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ কবিতাটি পুরো আবৃত্তি করে শুনিয়েছিল তাকে।
সেই কবিতা শুনে স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে পড়েছিলেন কিশোর রফিক আজাদ। অবাধ স্বাধীনতায়, বন্ধুদের সঙ্গে
আড্ডায় পড়ে নবম শ্রেণীতে ভালোভাবে পাস করতে পারলেন না আড্ডাপ্রিয় রফিক আজাদ। মাঈন
উদ্দিনও প্রথম থেকে তৃতীয় স্থানে নেমে আসেন। আড্ডার অন্য বন্ধুদের অনেকেই একাধিক বিষয়ে ফেল
করে বসলেন। সারা বছর অহেতুক আড্ডা দিয়ে পরীক্ষায় এই দশা। অবশেষে কবি, ব্রাহ্মণশাসন হাই স্কুল
থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করেন।

কবির উচ্চশিক্ষালাভ হয় ঢাকায়। পেশায় অধ্যাপক এই কবি টাঙ্গাইলের মওলানা মুহম্মদ আলী কলেজের
বাংলার লেকচারার ছিলেন। কাজ করেছেন বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন, উপজাতীয় কালচারাল
একাডেমি ও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে।

কবি রফিক আজাদ ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি ১৯৭১ সালে কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন
কাদেরিয়া বাহিনীর হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।

বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত কবি এবং অনুবাদক, কবি রফিক আজাদ বহু পত্রপত্রিকার নিয়মিত লেখক ছিলেন।
১৯৭২ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলা একাডেমীর মাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘উত্তরাধিকার’ এর সম্পাদক
ছিলেন। রোববার পত্রিকাতেও রফিক আজাদ নিজের নাম উহ্য রেখে সম্পাদনার কাজ করেছেন। তিনি
“উত্তরাধিকার” নামে একটি পত্রিকার সম্পাদনা করেন।

কবির প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে “অসম্ভবের পায়ে” (১৯৭৩), সীমাবদ্ধ জলে, সীমিত সবুজে (১৯৭৪),
সশস্ত্র সুন্দর (১৯৮২), এক জীবনে (১৯৮৩), শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৮৬), চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া, পাগলা গারদ
থেকে প্রেমিকার চিঠি, প্রেমের কবিতাসমগ্র, বর্ষণে আনন্দে যাও মানূষের কাছে, বিরিশিরি পর্ব, রফিক
আজাদ কবিতাসমগ্র, হৃদয়ের কী বা দোষ, কোনো খেদ নেই, প্রিয় শাড়িগুলো প্রভৃতি। রফিক আজাদের
প্রেমের কবিতার মধ্যে নারীপ্রেমের একটা আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে।

কবি বহু পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছিলেন। তার মধ্যে রয়েছে বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার
(১৯৮১), হুমায়ুন কবির স্মৃতি (লেখক শিবির) পুরস্কার (১৯৭৭), আলাওল পুরস্কার (১৯৮১), কবিতালাপ
পুরস্কার (১৯৭৯), ব্যাংক পুরস্কার (১৯৮২), সুহৃদ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৯), কবি আহসান হাবীব পুরস্কার
(১৯৯১), কবি হাসান হাফিজুর রহমান পুরস্কার (১৯৯৬), বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা (১৯৯৭), একুশে পদক
(২০১৩) প্রভৃতি।

Back to top button
Close