হাসন রাজা এর কবিতা সংগ্রহ

হাসন রাজা

অহিদুর রেজা চৌধুরী বা দেওয়ান হাসন রাজা চৌধুরী (ছদ্মনাম)। সুনামগঞ্জের লক্ষণশ্রী পরগনার তেঘরিয়া গ্রামে ৭ পৌষ ১২৬১ বাংলা (২৯ ডিসেম্বর ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দ), পিতা দেওয়ান আলী রাজা এবং মাতা মোছাম্মৎ হুরমৎজান বিবির ঘর আলোকিত করে এই মরমী কবির জন্ম হয়। পৈত্রিক বাড়ি রামপাশা, বিশ্বনাথ সিলেটে এবং মায়ের বাড়ি খালিয়াজুড়ি, নেত্রকোনা বৃহত্তর ময়মনসিংহে। ভাই দেওয়ান ওবায়দুর রাজা চৌধুরী এবং মোজাফফর রাজা চৌধুরী।
হাসন রাজার পুত্রদ্বয় খান বাহাদুর দেওয়ান গণিউর রাজা চৌধুরী, খান বাহাদুর একমিলুর রাজা চৌধুরী, দেওয়ান হাসিনুর রাজা চৌধুরী ও দেওয়ান আফতাবুর রাজা চৌধুরী।
হুরমৎ বিবি ছিলেন আলী রাজার খালাতো ভাই। আমির বখশ চৌধুরী নিঃসন্তান বিধবা। পরবর্তীতে হাসন রাজার পিতা আলী রাজা তাকে পরিণত বয়সে বিয়ে করেন। হাসন রাজার পিতা দেওয়ান আলী রাজা ছিলেন প্রতাপশালী জমিদার। হাসন রাজা জমিদার পরিবারের সন্তান। হাসনের পিতা দেওয়ান আলী রাজা তার অপূর্ব বৈমাত্রের ভাই দেওয়ান ওবেদুর রাজার পরামর্শ মতো তারই নামের আকারে তার নামকরণ করেন অহিদুর রেজা। হাসন রাজার পূর্ব পুরুষের অধিবাস ছিলো অয্যোধ্যায়। সিলেটে আসার আগে তারা দক্ষিণ বর্গের যশোর জেলার কাগদি নামক গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে সিলেট জেলার বিশ্বনাথ থানার কোণাউরা গ্রামে তার পূর্ব পুরুষ বিজ্জর শিং বসতি শুরু করেন। পরে কোন এক সময় বিজ্জয় শিং কোণাউরা গ্রাম ত্যাগ করে একই এলাকায় নতুন আরেকটি গ্রামের গোড়াপত্তন করেন।
হাসন রাজা সিলেটের রামপাশা ও সুনামগঞ্জের লক্ষণশ্রী (বা লক্ষণ ছিরি) জমিদার ও বাসিন্দা ছিলেন। তবে তার জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি পিতৃ ভূমি রামপাশার চেয়ে মাতৃভূমি লক্ষণশ্রীতে কাটিয়েছেন। তাই সঙ্গত কারণে তার পরিচিতিও গড়ে ওঠেছে সুনামগঞ্জের রাজা হিসাবে।
হাসন রাজার সময়ে সিলেটে আরবি, ফার্সির চর্চা খুব প্রবল ছিলো। সিলেটে ডেপুটি কমিশনার অফিসের নাজির আব্দুল্লাহ বলে এক বিখ্যাত ফার্সি ভাষাভিজ্ঞ ব্যক্তির পরামর্শ মতে তার নামকরণ করা হয় হাসন রাজা। বহু দলিল দস্তাবেজে হাসন রাজা আরবি অক্ষরে নাম দস্তখত করেছেন। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মতে তিনি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করেন নি, তবে তিনি ছিলেন সশিক্ষিত।
বংশের নিয়ম অনুযায়ী তিনি প্রথমে আরবি এবং পরে বাংলা পাঠ শুরু করেন। হাসন যে যুগে জন্মেছিলেন সে যুগে মুসলমান সমাজে ইংরেজি শিক্ষার তত প্রচলন না থাকায় বিদ্যালয়ের পড়াশোনায় তিনি বেশিদূর অগ্রসর হতে পারেন নি। নিজে আধুনিক শিক্ষায় বেশি অগ্রসর হতে না পারলেও শিক্ষার প্রসারে তিনি উদার হাতে সাহায্য সহযোগিতা প্রদান করতেন।
সুনামগঞ্জের প্রধান কটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠাকল্পে তার অফুরন্ত দান ছিলো। এর মধ্যে জুবিলী হাইস্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য জায়গা প্রদান উল্লেখযোগ্য। হাসন রাজার বড় ভাই ও বাবা চল্লিশ দিনের ব্যবধানে ইহলোক ত্যাগ করেন। তখন তিনি মাত্র ১৫ বছর বয়সে জমিদারিত্ব গ্রহণ করেন। আর সেই সময় থেকেই উনার আধ্যাত্মিক সাধনা ও চিন্তাধারার সূত্রপাত ঘটে। আর তখন থেকেই তিনি মরমী গান লেখা শুরু করেন।
হাসন রাজা গান রচনা ও গানের আসর জমাতেন। গায়কী দল নিয়ে নৌকা ভ্রমণ, নৌকা বাইচ, ঘোড় দৌড়, অন্যান্য, পাখি শিকার ও পালন, হাতির সওয়ারী হওয়া এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতেন। হাসন রাজা মুখে মুখে গান রচনা করতেন আর সহচর বৃন্দ নায়েব গোমস্তা সে সব গান লিখে রাখতেন। তার স্বভাব কবিত্ব, এসব গানে জন্ম নিতো। পরিমার্জনের সুযোগ খুব একটা মিলতো না।
তাই কখনো কখনো তার গানে অসংলগ্নতা, গ্রাম্যতা, ছন্দপতন ও শব্দ প্রয়োগে অসর্তকতা লক্ষ করা যায়। অবশ্য এই ক্রটি সত্ত্বেও হাসন রাজার গানে অনেক উজ্জ্বল পংক্তি, মনোহর উপমা, চিত্রকরের সাক্ষাৎ মেলে। হাসন রাজা সমাদৃত ও লোকশিল্প শুধু নয় সংগীতে ও সাহিত্যের মর্যাদা লাভ করেছে।
যৌবনকালে তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে বিশাল ভূসম্পত্তির মালিক ছিলেন। প্রথম যৌবনে তিনি ছিলেন ভোগবিলাসী এবং সৌখিন। রমনী সম্ভোগে তিনি ছিলেন অক্লান্ত। তার এক গানে নিজেই উল্লেখ করেছেনÑ ‘সর্ব লোকে বলে হাসন রাজা লম্পটিয়া’ প্রতি বছর বিশেষ করে বর্ষাকালে নৃত্যগীতের ব্যবস্থাসহ তিনি নৌকায় চলে যেতেন এবং কিছুকাল ভোগ বিলাসের মধ্যে নিজেকে নিমজ্জিত করে দিতেন। এর মধ্যেই তিনি বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে প্রচুর গান রচনা করেছেন।
নৃত্য এবং বাদ্যযন্ত্রসহ এসব গান গাওয়া হতো। আশ্চর্যের বিষয় হলো এসব গান জীবনের অনিত্যতা সম্পর্কে ভোগ বিলাসের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে নিজেকে স্মরণ করিয়ে দিতেন। হাসন রাজা পাখি ভালোবাসতেন। কুড়া ছিলো তার প্রিয় পাখি। তিনি ঘোড়া পোষতেন। তার প্রিয় দু’টি ঘোড়ার নাম ছিলো জং বাহাদুর এবং চান্দ মুশকি। এইভাবে হাসন রাজার ৭৭টি ঘোড়ার নাম মেলে।
মোটকথা সৌখিনতার পেছনেই তার সময় কাটানোই হয়ে ওঠলো তার জীবনের একমাত্র বাসনা। তিনি প্রজাদের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে লাগলেন। অত্যাচারী আর নিষ্ঠুর রাজা হিসেবে তিনি চিহ্নিত হয়ে ওঠলেন। হাসন রাজা ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের জড়ো করে রূপোর টাকা ছড়িয়ে দিতেন। বাচ্চারা যখন লুটোপুটি করে টাকা কুঁড়িয়ে নিতো তা দেখে তিনি খুব মজা পেতেন।
হাসন রাজার চিন্তা ভাবনার পরিচয় পাওয়া যায় তার গানে। অনুমান করা যায় তার গানের সংখ্যা হাজারেরও বেশি। হাসন উদাস গ্রন্থে ২০৬টি গান সংকলিত হয়েছে এর বাইরে আরো কিছু গান হাসন রাজার তিন পুরুষ এবং আল ইসলাহ সহ বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। শোনা যায় হাসন রাজার উত্তম পুরুষের কাছে তার গানের পান্ডুলিপি আছে। কালের নিয়মে কিছু গান বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
সৈয়দ মূর্তজা আলী মরমী কবি (হাসন রাজা) হাসন বাহার নামে আরো একটি গ্রন্থ কিছুকাল পূর্বে আবিস্কৃত হয়েছে। হাসন রাজার আরো কিছু হিন্দি গানেরও সন্ধান পাওয়া যায়। মরমী গানের ছক বাধা বিষয় ধারাকে অনুসরণ করেই হাসনের গান রচিত। ইশ্বানুরক্তি জগৎ জীবনের অনিত্যতা ও প্রমোদমত্ত মানুষের সাধন ভজনে অক্ষমতার খেদোক্তিই তার গানে প্রধানত প্রতিফলিত হয়েছে। কোথাও তিনি নিজেকে দীনহীন বিবেচনা করেছেন আবার তিনি অদৃশ্য নিয়ন্ত্রকের হাতে বাঁধা ঘুঁড়ি সে কথাও ব্যক্ত হয়েছে।
আত্মবিশ্লেষণ ও আত্মপোলব্ধির ভেতর দিয়েই হাসন রাজা মরমী সাধন লোকের সন্ধান পেয়েছিলেন। মরমী সাধনার বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে জাত, ধর্ম আর ভেদ বুদ্ধির উপরে ওঠা সকল ধর্মের নির্যাস। সকল সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যেই আধ্যাত্ম উপলব্দির ভেতর দিয়ে সাধক আপন করে নেন। তার অনুভবে ধর্মের এক অভিন্ন রূপ ধরা পড়ে।
হাসন রাজার সংগীত সাধনা ও দর্শন চেতনার প্রতিফলন আছে। হিন্দু ও মুসলিম ঐতিহ্যের যুগল পরিচয় তার গানে পাওয়া যায়। কয়েক বছর পূর্বে হিন্দু ঐতিহ্যের ধারা হাসন রাজার রক্তে প্রবহমান ছিলো। হাসন রাজার মরমী লোকে সাম্প্রদায়িক বিভেদের ঠাই ছিলো না। হাসন রাজা কোন পন্থার সাধক ছিলেন তা জানা যায় নাই। তার পদাবলীতে কোন গুরুর নাম নেই।
কেউ কেউ বলেন তিনি চিশতিয়া তরিকার সাধক ছিলেন। সূফীতত্বের প্রেরণা ও প্রভাব তার সংগীতে ও দর্শনে থাকলেও তিনি পুরোপুরি এই মতের সাধক ছিলেন না। নিজেকে তিনি বাউলা বা বাউল কখনো কখনো উল্লেখ করেছেন। হাসনের গানে আঞ্চলিক বুলি প্রচলন ও বাগধারার ব্যবহার লক্ষ করা যায়। তার গানের ভাষা ভঙ্গি ভাষা তাত্ত্বিকদের পর্যালোচনার আকর্ষণীয় উপকরণ হতে পারে।
হাসন রাজার কোনো কোনো গানে স্থান কাল পাত্রের পরিচয় চিহ্নিত আছে। লক্ষণছিরি ও রামপাশা তার জন্মস্থান ও জমিদারী এলাকার উল্লেখ বার বার এসেছে। পাওয়া যায় সুরমা ও আঞ্চলিক নদী কাপনার নাম। হাসন রাজা বাংলাদেশের একজন মরমী কবি এবং বাউল শিল্পি। মরমী সাধক বাংলাদেশে দর্শন চেতনার সাথে সঙ্গীতের এক অসামান্য সংযোগ ঘটিয়েছেন।
অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মতে লালনশাহ এর প্রদান পথিকৃৎ এর পাশাপাশি নাম করতে হয় ইব্রাহিম, তশ্রা, দুদ্দুশাহ, পাঞ্জশাহ, শীতালং শাহ, জালাল খা এবং আরো আনেকে। তবে দর্শন চেতনার নিরিখে লালনের পর যে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নামটি আসে তা হাসন রাজা। হাসনের দাদার মৃত্যুর পর তার বাবা মাতৃ এবং পিতৃ বংশীয় সকল সম্পদের মালিক হন।
১৮৬৯ সালে তার পিতা আলী রেজার মৃত্যুর ৪০ দিন পর তার বড় ভাই ওবায়দুর রাজাও মারা যান। ভাগ্যের এমন বিড়ম্বনার স্বীকার হয়ে মাত্র ১৫ বছর বয়সে হাসন জমিদারীতে অভিষিক্ত হন। হাসন রাজা সত্যিকার অর্থে সু-পুরুষ ছিলেন। তার উঁচু দেহ, দীর্ঘ বাহু, ধারালো নাক এবং কোকড়ানো চুল আর্যদের চেহারা স্মরণ করিয়ে দেয়।
হাসন রাজার প্রথম রচিত বই সৌখিন বাহার প্রকাশকাল ১৯৩১। দ্বিতীয় রচিত বই হাসন বাহার রচনাকাল ১৮৭২-১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দ। প্রথম প্রকাশ ১৯০৭ (হাসন রাজা কর্তৃক)। দ্বিতীয় প্রকাশ ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দ। হাসন রাজার ছেলে খান বাহাদুর দেওয়ান গণিউর রাজা কর্তৃক।
হাসন রাজার উল্লেখযোগ্য জামিদারী পরগন লক্ষণশ্রী বর্তমান সুনামগঞ্জ শহরের আশেপাশের কয়েকটি এলাকা, মহারাম, অচিন্তপুর, লাউর, পাগলা, পলাশ, বেতাল, চামতলা, কৌড়িয়া, কুরুয়া ইত্যাদি। হাসন রাজা দাপটের সঙ্গে রাজ্য পরিচালনা করতে থাকেন। কিন্তু এক আধ্যাত্মিক স্বপ্ন দর্শন হাসন রাজার জীবন দর্শন পাল্টে দিলো। মনের দুয়ার খুলে গেলো। চরিত্রে এলো এক সৌম্যভাব। বিলাসিতা ছেড়ে দিলেন।
শুধু বহির্জগৎ নয় অন্তর্জগতেও এলো বিরাট পরিবর্তন। সকল কাজের উপরে ছিলো তার গান রচনা। কালক্রমে মগ্ন হলেন প্রভু প্রেমে। তার সকল ধ্যান-ধারণা গান হয়ে প্রকাশ পেতে থাকলো। সেই গানে তিনি সুরারূপ করতে এভাবে ‘লোকে বলে বলেরে ঘর-বাড়ি ভালা নায় আমার’ তিনি সম্পূর্ণ বদলে গিয়ে জীব হত্যাও ছেড়েদিলেন।
হাসন রাজা মুসলিম ছিলেন কিন্তু তার গানে পূর্ব পুরুষের ধর্ম হিন্দু ধর্মের প্রতি প্রেমও লক্ষণীয় যেমন। ‘আমি যাইমু ও যাইমু আল্লাহর সঙ্গে/ হাসন রাজা আল্লাহ বিনে কিছু নাহি মাঙ্গে।’ কালের বহমানতায় মাত্র ৬৭ বছর বয়সে ১৯২২ইং সালের ৬ ডিসেম্বর মোতাবেক ২২ অগ্রহায়ন ১৩২৯ বাংলা সাধক মরমী কবি দেওয়ান অহিদুর রাজা উরফে হাসন রাজা মহান প্রভুর ডাকে সাড়া দিয়ে ইহধ্যাম ত্যাগ করেন।
হাসন রাজার জীবন সমাপ্তির সাথে সমাপ্তি ঘটে একটি ইতিহাসেরও। হাসন রাজা শুধু একজন বাউল বা মরমী সাধক নন। বর্তমান প্রজন্মের জন্য হাসন রাজা একটি ইতিহাসও বটে।
বাউল সাধক মরমী হাসন রাজার কবরস্থান লক্ষণশ্রী সুনামগঞ্জে মায়ের কবরের পাশে। যে কবরখানা মৃত্যুর পূর্বেই তিনি নিজে প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। মরমী কবি হাসন রাজার স্মৃতি বিজড়িত বাড়ি সুনামগঞ্জের তেঘরিয়া সুরমা নদীর পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে।

 

Back to top button
Close