হুমায়ুন কবির এর কবিতা সংগ্রহ

হুমায়ুন কবির

১.
হুমায়ুন কবির, ভারতীয় বাঙালি শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ, লেখক, সম্পাদক ও দার্শনিক। বলা হয়ে থাকে, ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থার সেরা ফসলরূপে গণ্য যেসব কর্মিপুরুষ পরবর্তীকালে স্বাধীন স্বদেশে বৌদ্ধিক ও প্রশাসনিক দিক নির্দেশনায় সফল ভূমিকা রেখেছেন, হুমায়ুন কবির ছিলেন তাঁদের অন্যতম। তিনি ১৯৬৯ সালের ১৮ আগস্ট হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। উল্লেখ্য যে, তাঁর জন্ম ১৯০৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরের কোমরপুর গ্রামে। হুমায়ুন কবির দুই দফায় ভারতের শিক্ষা মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। প্রথম দফায় জওহরলাল নেহেরুর মন্ত্রীসভায় এবং নেহেরুর মৃত্যুর পর লালবাহাদুর শাস্ত্রীর প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় হুমায়ুন কবির পুনরায় শিক্ষামন্ত্রীর পদ লাভ করেন। এছাড়া তিনি বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। হুমায়ুন কবির ‘চতুরঙ্গ’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক ছিলেন। মার্কসবাদ ও শরৎচন্দ্র সম্পর্কেও তাঁর মূল্যবান রচনা আছে। দর্শন ও সমাজতত্ত্ব সম্পর্কে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় তিনি বহু গ্রন্থ ও গবেষণামূলক প্রবন্ধ রচনা করেছেন।

২.
হুমায়ুন কবিরের (জন্ম : ২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯০৬ – মৃত্যু : ১৮ আগস্ট, ১৯৬৯) নাম শুনি, জানি কলেজ জীবনেই তাঁরই সুসম্পাদিত ‘চতুরঙ্গ’ পত্রিকা হাতে পেয়ে এবং পাঠ করে।পরে জাহাঙ্গীরন নগর বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে পত্রিকাটির পুরাতন সংখ্যাগুলো দেখতে পেয়ে, পড়ে পড়ে তাঁর সম্পর্কে আরো জানার আগ্রহ বেড়ে যায়। তাঁকে জানার চেষ্টার মধ্য দিয়েই তাঁর প্রতি আমার প্রেম বেড়ে যায়, না গিয়ে আর উপায় থাকে কী ? তাঁকে আমাদের স্বজনই বলে মনে হতে থাকে কারণ বাংলাদেশের ফরিদপুরে জন্মগ্রহণকারী পন্ডিত হুমায়ুন কবির পড়াশুনা করেন ম্যাট্রিকুলেশন পর্যন্ত বাংলাদেশেই। সে হিসেবে তিনি বাংলাদেশেরই মানুষ। তবে তিনি কলকাতাতে শুরু করেন তাঁর কর্মজীবন। এমনকি রাজনৈতিক জীবনের গোড়াপত্তন ও এর বিস্তৃতি সেখানেই ঘটে। হুমায়ুন কবির জাতীয় কংগ্রেস দলের তৎকালীন সভাপতি মওলানা আবুল কালাম আজাদের সেক্রেটারি হিসেবে ব্রিটিশ কেবিনেট মিশনের আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। হুমায়ুন কবিরের রাজনৈতিক চিন্তাধারা গঠনে মওলানা আবুল কালাম আজাদের প্রভাব ছিল অতীব গভীর। তিনি এককালে নিখিল ভারত ছাত্রকংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন। আবার তিনি শেরেবাংলা একে ফজলুল হকেরও ব্যক্তিগত সচিব ছিলেন। মওলানা আজাদ যখন শিক্ষামন্ত্রী, তখন হুমাযুন কবির ওই মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব এবং একসময়ে পূর্ণ সচিবও হয়েছিলেন। পরে তিনি নিজেও শিক্ষামন্ত্রী এবং আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সেই তাঁকে জানার পাঠ প্রক্রিয়ায় বেদনার সাথে খেয়াল করছি নানা কারণে বাংলাদেশের তৎকালীন পূর্ববাংলার মানুষের হৃদয় থেকে তিনি হয়তো অনেকটা দূরে সরে গিয়েছিলেন। ফলে হুমায়ুন কবিরের সাহিত্য ও অন্যান্য রচনা বাংলাদেশেও খুব একটা আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠেনি, বাংলাদেশে হুমায়ুন কবিরের জীবন ও সাহিত্যকর্মের মূল্যায়নধর্মী চর্চা খুব বেশি হয়নি।

৩.
হুমায়ুন কবির ১৯০৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুর জেলার কোমরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম হুমায়ুন জহিরউদ্দিন আমির-ই-কবির। পিতা কবিরউদ্দিন আহমদ ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। হুমায়ুন কবিরের পিতা ও পিতামহ দুজনেই ব্রিটিশ সরকারের নিকট থেকে ‘খান বাহাদুর’ উপাধি পেয়েছিলেন। তিনি নওগাঁর কে.ডি স্কুল থেকে ম্যট্রিক (১৯২২) এবং কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে লেটারসহ প্রথম বিভাগে তৃতীয় স্থান অধিকার করে আই. এ. (১৯২৪), ইংরেজিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে বি.এ. অনার্স (১৯২৬) এবং ইংরেজিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে এম. এ. (১৯২৮) ডিগ্রি লাভ। অধ্যয়ন শেষে সরকারি চাকরিতে না গিয়ে হুমায়ুন কবির শিক্ষকতার মানসে ১৯২৮ সালে সরকারি বৃত্তি নিয়ে অক্সফোর্ড যান। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একসেটর কলেজে ভর্তি হন। অক্সফোর্ড ইউনিয়নের সেক্রেটারি নির্বাচিত। অধ্যয়নের পাশাপাশি তিনি নিজেকে একজন তুখোড় ছাত্রনেতা ও বাগ্মিরূপে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি সেখানেও পরীক্ষাতে অসাধারণ ফলাফল অর্জন করেন। অক্সফোর্ড থেকে ‘মডার্ন গ্রেটস’ অর্থাৎ দর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে বি. এ. অনার্স ডিগ্রি লাভ (১৯৩১)।

৪.
হুমায়ুন কবির ১৯৩২ সালে রাধাকৃষ্ণনের আমন্ত্রণে অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের প্রভাষকরূপে যোগদান করেন। এক বছর পরে তিনি চলে আসেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি সাহিত্যচর্চা ও ট্রেড ইউনিয়ন রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হকের কৃষক-প্রজা পার্টির পক্ষ থেকে তিনি দীর্ঘ দশ বছর (১৯৩৭-৪৭) বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য ছিলেন। তিনি ছিলেন কৃষক-শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষার একজন শক্তিশালী প্রবক্তা। ভারতের তিনটি বড় বড় ট্রেড ইউনিয়নের তিনি সভাপতি ছিলেন।

৫.
হুমায়ুন কবির ১৯৪৬ সালে কংগ্রেস সভাপতি মাওলানা আবুল কালাম আজাদ-এর আমন্ত্রণে তাঁর একান্ত সচিবরূপে যোগদান করেন। পরে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানে মাওলানা শিক্ষামন্ত্রী থাকাকালে তিনি পর্যায়ক্রমে যুগ্ম শিক্ষা উপদেষ্টা, শিক্ষাসচিব ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত হন। ১৯৫৬ সালে তিনি ভারতীয় রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হন। প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু তাঁকে কেন্দ্রীয় সিভিল এভিয়েশনের প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত করেন এবং ১৯৫৮ সালে মাওলানা আজাদের মৃত্যুর পর তাঁকে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব দেন। এরপর তিনি বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিযুক্ত হন। ১৯৫৭ থেকে ১৯৬৯ সালে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি পশ্চিমবঙ্গের বশির হাট থেকে লোকসভার নির্বাচিত সদস্য ছিলেন।

৬.
নেহেরুর মৃত্যুর পর লালবাহাদুর শাস্ত্রীর প্রধান মন্ত্রিত্বের সময় হুমায়ুন কবির পুনরায় শিক্ষামন্ত্রীর পদ লাভ করেন। শাস্ত্রীর মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে মাদ্রাজের গভর্নর-পদ দিতে চাইলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। লোকসভার সদস্য-পদ এবং কংগ্রেস দল ত্যাগ করে বাংলা কংগ্রেস পার্টি গঠন তাঁর পরবর্তী চার বছরের রাজনৈতিক কর্মকান্ড। কেন্দ্রীয় কংগ্রেস নিয়ন্ত্রিত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পতন ঘটিয়ে একটি যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল (১৯৬৭)। হুমায়ুন কবিরের রাজনৈতিক জীবনে ভারতের শিক্ষা ও সংস্কৃতি নীতি চূড়ান্তরূপ লাভ করে।

৭.
জীবনের প্রতিটি পদচারণায় হুমায়ুন কবির সাফল্য অর্জন করেছেন। তাঁর সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য। লেখার জগতে প্রবেশ করে তিনি এক আকর্ষণীয় ভাষাভঙ্গি আয়ত্ত করেন। লেখকরূপে আত্মপ্রকাশের আগে তিনি বেশ কিছুদিন সম্পাদনার কাজ করেন। নওগাঁ কে.ডি হাইস্কুলের ম্যাগাজিন (১৯২০), প্রেসিডেন্সি কলেজ ম্যাগাজিন (১৯২৬), অক্সফোর্ডে Sis ও Cherwell নামক দুটি পত্রিকা এবং অক্সফোর্ড থেকে দেশে ফিরে ১৯৩২ সালে বারোমাসি নামে একটি মাসিক পত্রিকা তিনি সম্পাদনা করেন। তবে বাংলা সাময়িক পত্রের ইতিহাসে তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন তাঁর সম্পাদিত অতি উঁচুমানের ‘চতুরঙ্গ’ (১৯৩৯-৬৯) ত্রৈমাসিকের জন্য। এছাড়া দেশি-বিদেশি বহু প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে তিনি রিপোর্ট ও গ্রন্থাদি সম্পাদনা করেছেন। এ প্রসঙ্গে ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত বাংলা গল্প ও কবিতার সংকলন গ্রীণ এ্যান্ড গোল্ড বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

৮.
সাহিত্যক্ষেত্রে প্রথমত কবি হিসেবেই হুমায়ুন কবিরের আত্মপ্রকাশ ঘটে। তিনটি কাব্যগ্রন্থ স্বপ্নসাধ (১৯২৮), সাথী (১৯৩০) ও অষ্টাদশী (১৯৩৮) প্রকৃতি ও প্রেমবিষয়ক তাঁর স্বচ্ছ রোম্যান্টিক মানসের পরিচয় বহন করে। বন্ধুদের মতো ইউরোপীয় ধারার আধুনিকতার চর্চা না করে তিনি কাব্যক্ষেত্রে রবীন্দ্র ঐতিহ্যের অনুসরণ করেন। ১৯৪৩ সালে উর্দু থেকে মসদ্দসে হার্লী-র বাংলা অনুবাদ তাঁর অন্যতম কৃতিত্ব।

৯.
খুবই সংক্ষিপ্ত হলেও হুমায়ুন কবিরকে কথাসাহিত্যের জগতেও অনুশীলনব্রতী হতে দেখা যায়। তিরিশের দশকে তাঁর লেখা কয়েকটি ছোটগল্প স্বনামে ও বেনামে প্রকাশিত হয়। ১৯৪৫ সালে তাঁর নদী ও নারী উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় এবং একই বছর Men and Rivers নামে এর একটি ইংরেজি সংস্করণও প্রকাশিত হয়। এ উপন্যাসে কবির পদ্মানদীর পরিবেশে বাঙালি মুসলমান সমাজজীবনের একটি নিখুঁত চিত্র উপস্থাপন করেছেন। ১৯৬৫ সালে ঢাকায় উপন্যাসটি চলচ্চিত্রায়িত হয়।

১০.
একথা অবশ্য স্বীকার্য যে, হুমায়ুন কবিরের প্রধান পরিচিতি একজন প্রবন্ধকাররূপে। ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষায় তিনি দর্শন, সাহিত্য, শিক্ষানীতি ও সমাজতত্ত্ব বিষয়ে মৌলিক প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো: ইমানুয়েল কান্ট (১৯৩৬), শরৎ সাহিত্যের মূলতত্ত্ব (১৯৪২), বাংলার কাব্য (১৯৪৫), মার্কসবাদ (১৯৫১), নয়া ভারতের শিক্ষা (১৯৫৫), শিক্ষক ও শিক্ষার্থী (১৯৫৭), মিরজা আবু তালিব খান (১৯৬১), দিল্লী-ওয়াশিংটন-মস্কো (১৯৬৪), Kant on Philosophy in General (১৯৩৫), Poetry, Monads and Society (১৯৪১), Muslim Politics in Bengal (১৯৪৩), Rabindranath Tagore (১৯৪৫), The Indian Heritage (১৯৪৬, ১৯৬০), Science, Democracy and Islam (১৯৫৫), Education in India (১৯৫৬), Studies in Bengali Poetry (১৯৬৪), The Bengali Novel (১৯৬৮), Education for Tomorrow (১৯৬৮), Minorities in Democracy (১৯৬৯) ইত্যাদি। প্রথম জীবনে হুমায়ুন কয়েকটি নাটকও রচনা করেছিলেন যেগুলি অভিনীত হয়েছিল, কিন্তু মুদ্রিত হয় নি। তাঁর রচিত গ্রন্থসংখ্যা মোট ৪৫।

১১.
বক্তারূপে বিশেষ সুনামের অধিকারী হুমায়ুন কবির দেশে-বিদেশে বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণ পেয়েছেন। অক্সফোর্ডে আইনস্টাইন ও রাসেলের ওপর তিনি হার্বার্ট স্পেন্সার বক্তৃতা দিয়েছেন। এ কাজে এশীয়দের মধ্যে তিনিই প্রথম। ১৯৫৭ সালে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী আহূত কাগমারি সম্মেলনে তিনি ভারতীয় প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি আলীগড় (১৯৫৮), আন্নামালাই (১৯৫৯), খয়রাগড় (মধ্যপ্রদেশ, ১৯৬১), বিশ্বভারতী, মহীশূর ও এথেন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডি.লিট বা সমপর্যায়ের ডিগ্রি লাভ করেন।

১২.
বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে হুমায়ুন কবিরের আগে এতটা মেধার পরিচয় কেউ দেননি; সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ-এর মতে, ‘হুমায়ুন কবিরের এই বিস্ময়কর প্রতিভা শুধু ছাত্রজীবনেই সীমাবদ্ধ থাকে নাই। সত্য বটে, তিনি জীবনে কোনো পরীক্ষায় সেকেন্ড হন নাই- কলিকাতাতেও না, অক্সফোর্ডেও না। অক্সফোর্ড ইউনিয়নের মতো খান্দানি ও শরাফতির প্রতিষ্ঠানে প্রথম ভারতীয় সেক্রেটারি ছিলেন হুমায়ুন কবির। সে যুগে শুধু কলিকাতা, অক্সফোর্ড, কেম্ব্রিজে নয়, সারা ভারতের বিশ্ববিদ্যালয় মহলে হুমায়ুন কবিরের নাম শ্রদ্ধা ভালোবাসার সাথে উচ্চারিত হইত। এমন গৌরবের অধিকারীর সংখ্যা বেশি ছিল না।’ (হুমায়ুন কবির : জন্মশতবর্ষ স্মরণ গ্রন্থ : পৃ.-১০৯)। তিনি যে শুধু এ্যাকাডেমিকালি মেধাবী ছিলেন তাই নয়, বিশেষ করে তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ ‘বাংলার কাব্য’, উপন্যাস ‘নদী ও নারী’, শিক্ষা বিষয়ক তিনটি গ্রন্থ, রাজনীতি ও দর্শনের একাধিক গ্রন্থ এবং রবীন্দ্রনাথ ও শরৎ-সাহিত্যের ওপর লিখিত বইসমূহ সত্যিই উঁচুমানসম্পন্ন।

১৩.
হুমায়ুন কবির শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্যকে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, শুধু ভাষা শিক্ষার নামে ইংরেজি বা আরবি জানলেই শিক্ষাকার্য হয়ে গেল বলে তিনি কখনোই মনে করতেন না, যদি-না শিক্ষার মাধ্যমে ব্যক্তির মনোজগতের মুক্তি ঘটে। আসলে ঔপনিবেশিকতার জাল ছিন্ন করার লক্ষ্যেই তিনি এভাবে ভাবতেন। সে কারণে বিশেষ করে ইংরেজি শিক্ষাকে তিনি যেমন প্রাধান্য দিয়েছেন, একইভাবে সেই ইংরেজি শিক্ষা যদি- দাসত্ব করা যাবে ভালোভাবে, সেই মনোবৃত্তি থেকে হয়, এমন উদ্দেশ্যকে তিনি পরিহাস ও পরিহার করতে গিয়ে ‘শিক্ষক ও শিক্ষার্থী’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘বিদেশীর সুবিধার জন্য বিজাতীয় ভাষাকে কেবলমাত্র শিক্ষার বাহন করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি, শিক্ষার বাহনই হয়ে দাঁড়িয়েছে শিক্ষার লক্ষ্য।’ একই গ্রন্থে তিনি অন্যত্র লিখেছেন, ‘মেকলের এ শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল রাজকার্যের সৌকর্যের জন্য কেরানি তৈরি যারা আদেশ নেবে, আদেশ দেবে না।’ এই কথাটিকেই হুমায়ুন কবির আরো পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছেন এভাবে, ‘ইংরেজের সেদিন প্রয়োজন হয়েছিল কেরানির। …সে শিক্ষা তাই প্রশ্ন করতে শেখায়নি, প্রশ্নহীন নির্বিবাদে আদেশ পালনের মনোবৃত্তি রচনা করেই তৃপ্ত হয়েছে। সেজন্যই আমাদের দেশে অক্ষরজ্ঞানের বিস্তার যতটা বেড়েছে, শিক্ষিত অনুসন্ধিৎসু মনের সংখ্যা ততটা বাড়েনি। বহুদিন শিক্ষার এ গোড়ার গলদ ধরাও পড়েনি।’

১৪.
হুমায়ুন কবির সমাজে সবচেয়ে সম্মানের জায়গায় দেখতে চেয়েছেন শিক্ষকদের। প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষক হবে প্রাথমিক সমাজস্রষ্টা, এই হোক আজ আপনাদের সংহতি ও সংগঠনের ভিত্তি।’ অন্যদিকে সার্বিকভাবে শিক্ষক সম্প্রদায় সম্পর্কে গুরুত্ব আরোপ করে তিনি লেখেন, ‘ইচ্ছা থাকলেও শিক্ষার বিপ্লবসাধন অসম্ভব। সমস্ত শিক্ষার বাহন শিক্ষক এবং শিক্ষক সকল ক্ষেত্রেই প্রচলিত শিক্ষাপ্রণালীর আবহাওয়াতেই মানুষ হয়েছেন। তাই ইচ্ছা-অনিচ্ছায় শিক্ষক প্রচলিত শিক্ষাপ্রণালীকে কখনোই আমূল অস্বীকার করতে পারেন না। এ প্রসঙ্গে আরো একটি কথা স্মরণ রাখা প্রয়োজন। শিক্ষার ফলে ভবিষ্যৎ মানুষের মনোবৃত্তি, চরিত্র ও ভাগ্য নির্ণয় হয়। প্রচলিত শিক্ষাপ্রণালীর দোষত্র“টি যতই থাক না কেন, তারই মাধ্যমে সমাজ বর্তমান স্তরে পৌঁছেছে। ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক প্রচলিত শিক্ষাপ্রণালী তাই রাতারাতি বদলাবে না। ছোটখাট অদলবদল প্রতিনিয়ত চলবে, চলা প্রয়োজন। যাঁরা মনে করেন যে বিশেষ কোনো পদ্ধতির প্রচলনের ফলে আমাদের শিক্ষাসমস্যার চিরকালের মতন সমাধান হবে, তাঁরা শিক্ষার মর্মকথাই বোঝেননি। মানুষের মনের বিকাশ শিক্ষার লক্ষ্য। অভিজ্ঞতার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে মনের বিকাশের ধারা বদলায়।’

১৫.
হুমায়ুন কবির মুসলিম পরিবারের সন্তান হয়েও ব্রিটিশ-আশ্রিত উচ্চবর্ণের হিন্দুদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে যে মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন সেটা বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে আর কেউই তখন দেখাতে পারেননি। স্বাভাবিকভাবেই উচ্চবর্ণের হিন্দুদের শ্রেণি ও জাত-বিদ্বেষকে দু’হাতে ঠেলে হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সীমাহীন কষ্টের ভিতর দিয়ে এগিয়ে যেতে হয়েছিল তাঁকে। যতটা প্রতিকূলতার মধ্যে বিরূপ সময়ের মহাসমুদ্র পাড়ি দিতে হয়েছিল, সেই সীমাহীন যন্ত্রণা ও লড়াইকে নিজের জীবন দিয়ে যেমন মোকাবেলা করেছেন, একইভাবে বাঙালি অন্য মুসলমান ছাত্রদের সমস্যার কথাও তিনি বিশেষভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। ‘আমার মনে হয় বিশেষ করে মুসলমান ছাত্রদের বেলায় একথা স্বীকার না করে উপায় নেই; নেতৃত্বের অভাবে আমরা আজ পিছিয়ে পড়েছি, সে অভাব দূর করতে হলে আজ আমাদের বিশেষ চেষ্টা ও সাধনার প্রয়োজন। গত ১০০/১৫০ বৎসরের মুসলমানের ইতিহাস পতনের ইতিহাস, পরাজয়ের ইতিহাস। তাই সেদিনকার মনোবৃত্তি আজো যাঁদের আছে, তাঁরা পরাজয়ের চোখে রাজনৈতিক আন্দোলনকে দেখেন, এরকমই তাঁদের মনোবৃত্তি। তাই তাঁদের রয়েছে সতর্কভাবে নিজেকে রক্ষা করে চলবার মনোবৃত্তি। তাই তাঁদের মুখে এক কথা মুসলমানের জন্য চাই রক্ষাকবচ, চাই বিশেষ বন্দোবস্ত, চাই দুর্বলের জন্য অপরের প্রতি নির্ভরতা।’ উল্লেখ্য হুমায়ুন কবির ছিলেন এরূপ রক্ষাকবচের জন্য প্রার্থনা ও পরনির্ভরতার বিপক্ষে।

১৬.
বাংলা একাডেমী জীবনীগ্রন্থমালা প্রকল্পের অধীনে প্রকাশিত হয়েছিল শাহরিয়ার ইকবাল রচিত ‘হুমায়ুন কবির’(১৯৮৮)।গ্রন্থটিতে হুমায়ুন জীবন, সাহিত্য ও রাজনীতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। লেখক শাহরিয়ার ইকবাল হুমায়ুন কবিরের একান্ত স্নেহ-সান্নিধ্য পেয়েছেন বলে আন্তরিক উচ্চারণে হুমায়ুন কবিরের জীবনের কিছু অন্তরঙ্গ বিষয়ের অবতারণা করতে পেরেছেন। যেমন প্রেসিডেন্সি কলেজে তাঁর পাঠগ্রহণপদ্ধতি সম্পর্কে বলেছেন- প্রতিদিন ক্লাসে অধ্যাপকের বক্তৃতা থেকে তিনি যা লিখে নিতেন সেগুলো সেই রাত্রিতেই একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ নোটে পরিণত করতেন। এ ছিল কবিরের লেখাপড়া পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য। … এই মানুষটিই ক্লাসে অধ্যাপকের বক্তব্য শোনার সময়ে থাকতেন অন্য জগতে, তখন কেবল[মাত্র] অধ্যাপকের বক্তব্য শোনা ও যতটা সম্ভব লেখা ছাড়া কবিরের অন্য কোনো চিন্তা থাকত না। … এটাই বোধহয় কবিরের সাফল্যের চাবিকাঠি ছিল। (শাহরিয়ার ইকবাল, ‘হুমায়ুন কবির’, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৮৮, পৃ. ২৪-৫৫)।

১৭.
মনজুরে মওলা সম্পাদিত ‘শ্রাবণ’ পত্রিকা (জানুয়ারি-মার্চ ১৯৮৭) সংখ্যাটিতে হুমায়ুন কবির নিয়ে লেখাগুলোর পাঠও আমাকে ঋদ্ধিমান মানুষটি সম্পর্কে উৎসাহ বাড়িয়ে দেয়। খুঁজে পাই বাংলাদেশে ‘হুমায়ুন কবির’-চর্চায় আরেকটি পত্রিকা। মোহাম্মদ শাকেরউল্লাহ সম্পাদিত ‘ঊষালোকে’ পত্রিকার ৫ম বর্ষ ১ম-৪র্থ সংখায় (আগস্ট ১৯৮৭) হুমায়ুন কবির ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয়। এতে আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘হুমায়ুন কবির’ ও বুদ্ধদেব বসুর ‘হুমায়ুন কবিরের অষ্টাদশী’ নামে দুটি প্রবন্ধ পুনর্মুদ্রিত হয়। এছাড়া পুনর্মুদ্রিত হয়েছে হুমায়ুন কবিরের ‘ইকবাল ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য’ ও ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘিষ্ঠ’ নামের দু’টি প্রবন্ধ তাঁর উপন্যাস ‘পদ্মা’র অংশবিশেষ। ‘পদ্মা’ উপন্যাসটিই পরে ‘নদী ও নারী’ নামে পুনর্বিন্যস্ত হয়। (‘ঊষালোকে’-সম্পাদক মোহাম্মদ শাহেরউল্লাহর সঙ্গে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার, ২৪.১১.২০০৮) ষষ্ঠ বর্ষ ১ম-৪র্থ সংখায় (নভেম্বর ১৯৮৮) আবু রুশদ-এর ‘হুমায়ুন কবির ও তাঁর উপন্যাস নদী ও নারী’ এবং খোন্দকার সিরাজুল হকের ‘হুমায়ুন কবিরের সাহিত্য-চিন্তা’ নামের দুটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। এছাড়া হুমায়ুন কবিরের সহোদর আকবর কবিরের একটি চিঠি এবং হুমায়ন কবিরের ‘পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ-তালিকা’ প্রকাশিত হয়। এ সংখ্যার সম্পাদকীয়তে অঙ্গীকার করা হয়, ‘হুমায়ুন কবির বিষয়ক আরো লেখা পেলে, ভবিষ্যতে তা উষালোকে প্রকাশ করতে আমরা আগ্রহী।’ (সম্পাদকীয়, মোহাম্মদ শাকেরউল্লাহ সম্পাদিত ‘ঊষালোকে’, ঢাকা, ষষ্ঠ বর্ষ ১ম-৪র্থ সংখ্যা, নভেম্বর ১৯৯৮) এই অঙ্গীকার পালনে সম্পাদক আন্তরিক নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন। ‘ঊষালোকে’র নবপর্যায়ের প্রথম সংখ্যা (অক্টোবর ২০০১) প্রকাশিত হয় হুমায়ুন কবিরের ‘নদী ও নারী’ সংখ্যা হিসেবে। এতে এই কালজয়ী উপন্যাস সম্পর্কে আলোচনা-মূল্যায়ন ছাড়াও রয়েছে ‘নদী ও নারী’ উপন্যাসটি মুদ্রিত হয়েছে। পাশাপাশি মূর্তজা বশীর কর্তৃক এর চিত্রনাট্যও এর বাড়তি পাওনা। সংযোজিত হয়েছে ‘নদী ও নারী’ চিত্রনাট্য প্রসঙ্গে মূর্তজা বশীরের সাক্ষাৎকার এবং চিত্রনাট্য নিয়ে তানভীর মোকাম্মেলের একটি চমৎকার রচনা। ‘নদী ও নারী’ উপন্যাস নিয়ে যাঁরা লিখেছেন তাঁরা হলেন আবু রুশদ, মহম্মদ মিজানুর রহমান, আহমাদ মাযহার, মাসুদুল হক, অনিরুদ্ধ কাহালি ও জাফর আহমদ রাশেদ। নব পর্যায়ের দ্বিতীয় সংখ্যায় (জানুয়ারি ২০০২) হুমায়ুন কবিরের প্রবন্ধগ্রন্থ ‘বাংলার কাব্য’ সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এই গ্রন্থ সম্পর্কে লিখেছেন আনিসুজ্জামান, অমলেন্দু বসু, খন্দকার মুজাম্মিল হক, বিশ্বজিৎ ঘোষ, আহমাদ মাযহার, সরকার আবদুল মান্নান, মাসুদুল হক, অনিরুদ্ধ কাহালি, মোহাম্মদ মোস্তফা, মনি হায়দার ও ওয়ালী নেওয়াজ। এছাড়া এই গ্রন্ধেুর দুটি সংস্করণে আহমদ ছফা ও আবদুল মান্নান সৈয়দ লিখিত ‘মুখবন্ধ’ মুদ্রিত হয়েছে প্রাসঙ্গিক বিবেচনায়। ‘বাংলার কাব্য’ গ্রন্থের মূল পাঠও এই সংখ্যার অন্যতম আকর। ‘বাংলার কাব্য’ নিয়ে এই আয়োজনের মাধ্যমে মোহাম্মদ শাকেউল্লাহ তাঁর ‘হুমায়ুন কবির’-চর্চায় নতুন মাত্রা সৃষ্টি করলেন। তাছাড়া ‘কালি ও কলম’ পত্রিকা হুমাযুন কবির সম্পর্কে বেশ কিছু প্রবন্ধ প্রকাশ করেছে। কবি আবুল হোসেন ও প্রাবন্ধিক স্বপন মজুমদারের দুটি প্রবন্ধ প্রকাশ করে ‘কালি ও কলম’ হুমায়ুন কবিরের প্রতি জন্মশতবার্ষিক শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ পেয়েছে। বাংলাদেশে ‘হুমায়ুন কবির’-চর্চা বিষয়ে তপন বাগচীর মূল্যায়ণ শোনা যাক- ‘বাংলাদেশে ‘হুমায়ুন কবির’-চর্চা তেমন তোড়জোড়ভাবে হয়নি। সরকারি উদ্যোগ একেবারেই নেই। তাঁর জন্মশতবার্ষিক অনুষ্ঠান জাতীয় পর্যায়ে হলেও তার পেছনে ছিল খুশি কবির, আহমাদ মাযহার-সহ দু’একজন ব্যক্তির কর্মপ্রয়াস। তবে এ-ক্ষেত্রে না মেনে উপায় নেই যে, হুমায়ুন-চর্চায় মোহাম্মদ শাকেরউল্লাহ অবদান যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। বলা যায়, বাংলাদেশে হুমায়ন কবির-চর্চায় তিনিই পথিকৃৎ। পরবর্তীকালে আরো অনেকের অংশগ্রহণে এই ধারা বেগবান হয়েছে। এবং হুমায়ুন কবির সম্পর্কে অকর্ষিত অনেক বিষয়ে এখনো তথ্য-উদ্ধার ও আলোচনা-গবেষণার সুযোগ রয়েছে। ভবিষ্যতের কোনো গবেষক এসে সেই কাজ সম্পন্ন করবেন, সেই প্রত্যাশা আমাদের রয়েছে।’

১৮.১
হুমায়ুন কবির ১৯৪৩ সালের ২২ ও ২৩ শে ডিসেম্বর বরোদায় ‘সংস্কৃতির সমন্বয়’ শীর্ষক কীর্ত্তিমন্দির বক্তৃতা দিয়েছিলেন। হুমায়ুন কবিরের ‘সংস্কৃতির সমন্বয়’ প্রবন্ধের চুম্বকাংশ পাঠ করা যেতে পারে।তিনি লিখছেন, ‘ভারতীয় সংস্কৃতির ইতিবৃত্ত আলোচনা করলে দেখা যায় তা ধারাবাহিক, সংশ্লেষণমূলক ও ক্রমবর্দ্ধমান। এই ভারতবর্ষের মাটিতে অতীতকালে বহু বিপরীত উপাদানের সমন্বয় ঘটেছিল। ইসলামের আবির্ভাবে বিরোধ ও সমন্বয়মূলক সেই একই প্রক্রিয়া হাজারগুণে বদ্ধিক হয়ে দেখা দিল। এদেশের ইতিহাসে এই প্রথম ভারতবর্ষের ধম্মীয় ও সামাজিক সংস্থানকে উপযুক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীর হতে হলো। এমন একটি জীবনদর্শনের মুখোমুখি এসে তাকে দাঁড়াতে হলো যা তারই মত পরিণত ও সুনিদ্দিষ্ট। দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য তাদের ভেতরকার সংঘাত আরও বেশি প্রকট হয়ে উঠলো।… ভারতবর্ষের উপর ইসলামের প্রভাব খুব গভীর ও নিবিড় হয়ে দেখা দিয়েছিল। পুরাতন চিন্তাধারার সঙ্গে নতুন চিন্তাধারার সংযোগের ফল এই হলো যে যাঁদের মন তীক্ষ্ণও অনুভূতিপ্রবণ, তাঁরা বিশ্বের সনাতন সমস্যগুলো নিয়ে আবার নতুন করে ভাববার তাগিদ বোধ করলেন। প্রাচীন রীতিনীতির অত্যাচার থেকে মানুষের মন হলো মুক্ত। হিন্দু ও ইসলামীয় চিন্তাধারার সংযোগকে চিহ্নিত করবার জন্যে দেখা দিল নতুন ধর্ম্ম, নতুন জীবনবাদ। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই উভয় সংস্কৃতির মধ্যে মিলনের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে পারে নিএইজন্যে যে স্থানিক ব্যবধান ও দুরধিগমতা তখনো প্রবলরূপে বর্ত্তমান ছিল। রাজধানী ও পল্লীজীবনের মধ্যে চিন্তা ও সংস্কৃতির যোগ তখনও মাত্র আংশিকরূপে বিদ্যমান। নগরগুলোতে অবশ্য এই দুই সংস্কৃতির মিলন ঘটেছিল, মুসলমানের সংখ্যালঘুতার অসুবিধা তার রাজনৈতিক গুরুত্বের দারুন চাপা পড়ে গিয়েছিল। ক্ষুদ্র, সংহত ও মোটের উপর একজাতিবদ্ধ মুসলমান অভিজাত সম্প্রদায় নাগরিক সংস্কৃতিকে একটি বিশিষ্ট রূপ দিলেন। গ্রামাঞ্চলে কিন্তু তা হলো না। যাতায়াতের সুবিধা না থাকায় স্থানীয় সম্প্রদায়গুলির তাদের স্বতন্দ্র সত্তা অনেকখানি অব্যাহত রাখ্লো। মানুষে সানুষে নিয়মিত অদলবদল কিম্বা বিভিন্ন ভাবধারার নিয়ত বিনিময় না ঘটলে যা হয় তাই হলো : সামাজিক ব্যবস্থার অন্তনিহিত কঠোরতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো। ফলে গ্রামাঞ্চলবাসি মুসলমানেরা হিন্দু জীবনের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ল। ধর্ম্মবিশ্বাসে ব্যাপক পরিবর্তন সূচিত হলেও গ্রামীন সংস্কৃতি মূলত হিন্দুই রয়ে গেল, কেন না মানুষ তার ধর্মবিশ্বাস বদলালেও জীবনযাত্রা বদলালো না।… দর্শন ও অর্থনীতির ক্ষেত্র প্রথম দৃষ্টিতে পরস্পর থেকে সম্পূর্ণ বিশিষ্ট বলে মনে হলেও এই দুই ক্ষেত্রে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে সহযোগিতার নির্ভুল প্রমাণ পাওয়া যায়। বস্তুত ভারতীয় হিন্দুর বর্ত্তমান দৃষ্টিভঙ্গির কতকটা অংশ বেদ-উপনিষদ থেকে আহৃত কতকটা অংশ ইসলামের শিক্ষা থেকে নেওয়া সে সম্বন্ধে ঠিক করে কিছু বলা কঠিন। ঠিক একই ভাবে, আচার আচরণে বিশ্বাসে ও বিধিতে ভারতীয় মুসলমানের মধ্যে হিন্দু সংস্কৃতি ও দৃষ্টিভঙ্গির সুস্পষ্ট প্রভাবের প্রমাণ মেলে। ভারতবর্ষে প্রভাব যে শুধু মাত্র ভারতীয় মুসলমানের ক্ষেত্রেই নিবদ্ধ ছিল তা নয়, তা পারষ্য ও আরবের মুসলিম ধর্মবিশ্বাসকেও প্রভাবিত করেছিল। বৌদ্ধ চিন্তার ধারা সুদুর মিশর পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত হয়েছিল। পন্ডিতদের মধ্যে কেউ কেউ বৌদ্ধদের প্রথম দিকের রচনা ও নির্দ্দেশের মধ্যে বাইবেলের Sermon on theMount-এর সূত্র আবিষ্কার করেছেন। এসেনীয়দের কখনও কখনও এসিয়ামাইনরবাসী বৌদ্ধ সম্প্রদায় বলে মনে করা হয়। সুফিবাদের মূল অবশ্য কোরানে নিহিত, কিন্তু ভারতীয় চিন্তাধারার দ্বারা তা গভীরভাবে প্রভাবান্বিত হয়েছে। খৃষ্টধর্ম, নব্যপ্লেটোবাদ, জরথ্রষ্টের ধর্ম ও অদ্বৈতবাদ, এর বিকাশে সহায়তা করেছে বটে কিন্তু সুফিবাদ বাহ্যিকভাবে সব চাইতে বেশি প্রভাবিত হয়েছে হিন্দু ও বৌদ্ধ দর্শনদ্বারা। তা যদি না হতো তবে এর বিশুদ্ধাত্বার মধ্যে ব্যক্তিসত্তাকে ডুবিয়ে দেবার সাধনা আমরা বোঝাতে পারতুম না। আমরা জানি মুসার কাল থেকে আরম্ভ করে সেমিতিক ধর্মের যে ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে, ব্যক্তিসত্তা বিলাপের এ সাধনা তার বিরোধী। … মধ্যযুগীয় ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও সেই একই বিরোধ ও সমন্বয়ের ইতিহাস। নূতন বিজয়ের ফলে এক অভিনব সামন্ততন্ত্রের সৃষ্টি হয়েছিল। তার ফলে পুরাতন কৃষিব্যভস্থার পরিবর্ত্তন দেখা দেয়। আটঘাঁট বাঁধা পুরাতন ব্যবস্থা সত্ত্বেও সম্রাট আলাউদ্দিন মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির মূল্য বেঁধে দেবার চেষ্টা করেছিলেন। সে চেষ্টা অসম্পূর্ণ হলেও তারমধ্যে ব্যক্তিগত স্বার্থের সীমা অতিক্রম করে সমাজচেতনার ইঙ্গিত মেলে। মুহাম্মদ তুঘলকের চামড়ার নোট প্রচলনের অকাল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল বটে কিন্তু তাতেও মুদ্রার যে নিজস্ব যথার্থ কোন মূল্য নাই, তা বিনিময়ের বাহন মাত্র, তারই ক্ষীণ চেতনার আভাস পাওয়া যায়। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ের এই পারস্পরিক মিলন ইতিহাসের যত্নবান ছাত্রের চোখ এড়ায় নাই। ধনতন্ত্র ও একজাতিশাসিত রাষ্ট্রের (Nation-state) মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক আমরা লক্ষ্য করি, কিন্তু ভারতের ইতিহাসের বেলায় সেই সম্পর্কের কথা আমাদের মনে হয় না, মনে হলেও তাকে আমরা আমল দিই না। যে-পদ্ধতি অনুসরণ করার ফলে আকবর একপ্রকার তাঁর নিজের অজ্ঞাতসারেই এ দেশে ধনতন্ত্রের অভ্যুদয়ের পথ প্রস্তুত করে গিয়েছিলেন তা কারও চোখে পড়েছে বলে মনে হয় না। শেরশাহ্ ভূমিব্যবস্থার নতুন সংগঠন সুরু করেছিলেন। আকবরের আমলে তার সমাপন হয়। এ পরিণতি ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-ব্যবস্থার দ্বারা সামন্ততন্ত্রের ভবিষ্যত উচ্ছেদের সম্ভাবনাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। সেই প্রক্রিয়া কিন্তু সম্পূর্ণ হয় নাই। প্রাকৃতিক শক্তির প্রভুত্ব ও ব্যবহার তার প্রাথমিক সর্ত্ত, তখন পর্য্যন্ত সেই প্রথম সর্ত্তটীই পূরণ হয় নাই।… ঐক্য ও ধারাবাহিকতার প্রেরণা ভারতের শিল্পকলার সর্ব্বতোমুখী বিকাশের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট। বিভেদের মধ্যে ঐক্য এই নীতির উপরই ভারতীয় শিল্পকলার ভিত্তি। ধর্ম্মের ক্ষেত্রে এই নীতি মনকে সমস্ত বাহ্যিক ঘটনার বিমূর্ত্ত রূপের দিকে আকর্ষণ করেছে। অনির্ব্বচনীয় আবেগের মধ্যে ভগবানের সঙ্গে ব্যক্তির একাত্মবোধ অনুভব তার সাধন পদ্ধতির লক্ষ্য। সেই অন্তনিহিত ঐক্য সাধনের পরে পার্থিব বিষয়ে মনোনিবেশে বাধা ছিলনা। ঘটনার বৈচিত্রকে একটি মূল ঐক্যের বিভিন্ন তাৎপর্য্যময় প্রকাশরূপে ভাবা সহজ। স্থাপত্য হলো নিরেট বস্তুপুঞ্জর সাহায্যে এই চেতনার রূপায়ন। মন্দিরের বহিরঙ্গে রূপের প্রাচুর্য্য! শূন্যস্থান কোথাও এতোটুকু চোখে পড়ে না। বিচিত্র কারুকার্য্য ও অলঙ্করণের সীমাহীন ব্যাপ্তি। সেই সত্যস্বরূপেরই প্রকাশ যা রূপাতীত, যার ভেতর সমস্তরূপই সূক্ষ্মভাবে বিধৃত হয়ে আছে। এদিকে মন্দিরাভ্যন্তর একটি ছোট্ট অন্ধকার কুঠরীমাত্র- তাতে এক চিলতে আলো ঢোকে কীনা সন্দেহ। সেখানে মানুষের আত্মাকে চিরন্তন রহস্যের মুখোমুখি একা গিয়ে দাঁড়াতে হয়। … শিল্পকলার ভেতর দিয়েই প্রধানত জাতি অমরত্ব লাভ করে। রাষ্ট্রনৈতিক পটভূমি দিন থেকে দিনে পরিবর্ত্তিত হ’তে পারে। পরিবর্ত্তমান দৃশ্য বহুক্ষেত্রেই মানুষের মনে স্থায়ী ছাপ ফেলেনা। দর্শনের ক্ষেত্রে পর্যন্ত অনেক সময় খুঁটিনাটি বৃত্তান্তের চাপে সমগ্রের ধারণা মন থেকে তিরোহিত হয়। শেষে এমন হয় যে বুদ্ধির সূক্ষ্ম কারিকুরির গোলকধাঁধায় আত্মা নিঃশেষে হারিয়ে যায়। শিল্পকলার ব্যাপারে কিন্তু যা সরল ও মৌলিক তাই শেষ পর্যন্ত টেকে এবং জাতির চেতনায় তাদের ছাপ রেখে যায়। সেইজন্যেই শিল্পকলা জাতির গুঢ় চরিত্রকে প্রকাশিত করে, পরবর্তী যুগ ও মানুষের হিতার্থে তাকে সুনির্দ্দিষ্ট আকার দিয়ে যায়। শিল্পকলার মধ্যে আবার চিত্রকলা হলো সবচাইতে মৌলিক ও শ্বাশ্বত। বাক্য সামাজিক ভাববিনিময়ের উপায়মাত্র; সমাজরূপের পরিবর্ত্তনের সঙ্গে সঙ্গে কথারও রূপ বদলায়। সঙ্গীত অবশ্য মৌলিক, কিন্তু তার আবেদনকে শ্বাশ্বত বলা চলে কিনা সন্দেহ। সঙ্গীত যেসব অনুভূতির সৃষ্টি করে, তা এতোই দ্রুতসঞ্চরমাণ ও নিরাবয়ব যে তার আবেদন আত্মাকে উদ্দীপিত করেই ক্ষান্ত হয়। স্পষ্ট আকার না থাকায় সঙ্গীতের মধ্যে দিয়ে কখনও জাতির সবিশেষ জাতীয় প্রতিভার পূর্ণপ্রকাশ হতে পারে না।’ …

১৮.২
হুমায়ুন কবির বলছেন, ‘প্রেমকে যে ভাবেই বিশ্লেষণ করা যাক্না কেন, শেষ পর্য্যন্ত তাকে এক বিশেষ ধরণের খেলা বলে মান্তে হয়। বৈষ্ণব কবিতায় একেই বলা হয়েছে ‘লীলা’- যা অজানিত ও অজ্ঞেয় আত্মার নর্ম্মক্রীড়া স্বরূপ। এই লীলা বিশুদ্ধ লীলা কিন্তু তবু বৈষ্ণব কবিতার ‘লীলায়’যেন খানিকটা পুরনো দিনের নিষ্ক্রিয়তার আমেজ পাওয়া যায়। বিভিন্ন আবেগ ও অনুভূতির ক্ষেত্রে কবি সর্ব্বদাই ভালোবাসার নিষ্ক্রিয় পাত্র এইটেই চোখে পড়ে। কোথাও সে প্রেমিক নয়। সর্ব্বত্রই সে প্রেমাস্পদ- দয়িত। প্রথম দৃষ্টিতে হয়তো একে অপরিহার্য্য বলেই মনে হবে। বিশুদ্ধাত্মার সঙ্গে মানবাত্মার যে-সম্পর্ক তা বশ্যতা ও আত্মদানের সম্পর্ক ছাড়া আর কি হতে পারে? কিন্তু এ ধারণা ভুল। সাধারণ বুদ্ধি দিয়ে বিচার করলে, অসীমের প্রতি মানবাত্মার এই যে আকুতি তা রূপকমাত্র, উপমার ক্ষেত্রেই তার যা কিছু সার্থকতা। কিন্তু যখন সেই আকুতিকে আর মায়া ব’লে ভ্রম করা চলে না, আত্মার পক্ষে যা যখন একমাত্র বাস্তব সত্যে পরিণত হয়, আমরা তখন এমন এক স্তরের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হই, যেখানে বিষয় ও বিষয়ীর পার্থক্য একেবারে ঘুচে যায়। তখন আর মানবাত্মাকে পরবশ্য ও সীমাবদ্ধ ব’লে মনে হয় না। এই স্তরে প্রেমিক ও প্রেমাসম্পদের ব্যবধান লুপ্ত হয়। বৈষ্ণব কবিতায় কিন্তু এই ব্যবধান লেগেই আছে। তাতেই মনে হয় মায়াবাদের ধারণাকে নিঃশেষে দূর করা সম্ভব হয় নি। এদিকে আবার প্রেমকে ‘লীলা’বা বিশুদ্ধ ক্রীড়া ব’লে কল্পনা করা হয়েছে। এতে এই বোঝাচ্ছে যে নূতন বিশ্বাসের ফলে জীবন সম্বন্ধে দৈবধারণার ভিত্তিমূল পর্য্যন্ত নড়ে উঠেছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও নূতন বিশ্বদৃষ্টি পুরাতনকে সম্পূর্ণ রূপান্তরিত করতে পারে নি।’

১৮.৩
হুমায়ুন কবির মনে করেন, ‘হিন্দু ও মুসলমানের জীবনবাদের মধ্যে যে সমম্বয় ঘটেছিল তার ফলেই এটা হয়েছে বলে মনে হয়। প্রাক্-মুসলিম যুগের ভারতীয় মনের অধিকাংশ অভিব্যক্তিই মায়াবাদের রঙে রঞ্জিত। মায়াবাদী বিশ্বদৃষ্টি ব্যক্তির বিকাশে সামান্যই সহায়তা করে। ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির পার্থক্যের চেতনাও সেখানে ক্ষীণ। সাধারণ মানুষ কেন যে মুখ বুজে জীবনের সমস্ত বৈষম্য ও লাঞ্ছনা সহ্য করেছিল মায়াবাদের মধ্যে তার খানিকটা কারণ খুঁজে পাওয়া যায়। জন্মান্তরে বিশ্বাসও এই ধারণার প্রত্যক্ষ ফল। জন্মান্তরবাদ একদিকে মানুষের প্রগতিতে অবিশ্বাসী, অন্যদিকে সমস্ত প্রাণীর মূলীভূত ঐক্য ও সাম্যের উপর জোর দিয়ে জীবনের প্রত্যক্ষ বৈষম্যকে খানিকটা দূর করে। যে আদর্শে কীটপতঙ্গ পশুপক্ষী ও মানুষকে একই দৃষ্টিতে দেখা হয়, সেই আদর্শ কখনই অগ্রগতি কিম্বা মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের ধারণার উপর জোর দিতে পারে না, দিতে গেলে তার নিজের মতকেই খ-ন করা হয়। অপরপক্ষে, ইস্লাম মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের উপর জোর দিলো এবং তাকে জীবজগতে প্রভু ব’লে ঘোষণা করলো। ইস্লামের মতে মানুষ শুধু ঈশ্বরের অধীন, আর কারও নয়। এই বিশ্বাসটিকেই বৈষ্ণবকবি চন্ডীদাস তাঁর প্রসিদ্ধ একটি কবিতায় ব্যক্ত করেছেন এইভাবে : ‘শুনহ মানুষ ভাই, / সবার উপর মানুষ সত্য, তাহার উপর নাই।’

১৮.৪
হুমায়ুন কবির বলছেন, ‘ভারতীয় সংস্কৃতির বিবর্ত্তনের ইতিহাসে হিন্দু ও মুসলিম ভাবের যে সমন্বয় ঘটেছিল তার কয়েকটি দিক উপরে দেখানো হলো। বিবরণটুকু স্বভাবতই অসম্পূর্ণ থাকতে বাধ্য। যখন দুটি প্রবল স্রোতের মিলন হয় কে কাকে গ্রাস করলো সে প্রশ্ন ওঠে না। দুটি স্রোত মিলে তখন এক নূতন আকার ধারণ করে। সেই অবস্থায় তাদের স্বতন্ত্র দানকে চিন্বার আর উপায় থাকে না। যখন দুটো জীবন্ত প্রাণী মিলিত হয় তখনও সেই একই প্রক্রিয়া ঘটে। জীবের মিলনে যে নূতন জীবের জন্ম হলো তা পিতামাতার গুণাগুণ গ্রহণ করেও স্বতন্ত্র জীব, অভিনব জীব। এই নূতন সমম্বয়ে একটি ভাব আরেকটি ভাবে সম্পূর্ণ অনুপ্রবিষ্ট হয়, কোন জিনিষই তাতে অপরিবর্ত্তিত অবস্থায় থাক্তে পারে না। … মধ্যযুগে ভারতীয় সংস্কৃতির বিবর্ত্তনের বেলায় ঠিক এই জিনিষটিই ঘটেছিল। পুরাতন বিশ্বাস পরিবর্ত্তিত হলো, এমন কি পুরাতন বিষয়বস্তু পর্যন্ত নূতন ভাবদ্বারা উদ্দীপ্ত হলো। মননের ক্ষেত্রে যে যে পরিবর্ত্তন ঘটেছিল এবং চিত্রকলা, স্থাপত্য ও কবিতার ক্ষেত্রে যে যে কীর্ত্তি সাধিত হয়েছিল তাদের কথা আমরা বলেছি। তবে তাতে সামান্য মাত্র বলা হয়েছে, কারণ জীবনের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে সমন্বয়ের সেই একই ইতিবৃত্তের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। একটি নূতন ভাষার জন্ম ও বিকাশের ইতিবৃত্ত ভালো করে জানতেই একজীবন কেটে যাবার কথা। ভারতীয় চিত্রকলা ও সঙ্গীতের সুর ও ভাবে যে সূক্ষ্ম পরিবর্ত্তন সূচিত হয়েছিল তাও অনুরূপ চমৎকার অনুধাবনীয় বিষয়। … এই সমন্বয়ের প্রবণতা কিছু নূতন ব্যাপার নয়, কারণ প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির বিকাশেও ঠিক একই জিনিস চোখে পড়ে। মধ্যযুগে যেকটি সংস্কৃতি সমম্বয়ের সাধারণ ক্ষেত্রে এসে মিলিত হয়েছিল তাদের প্রত্যেকটিই ছিল প্রাণ বন্ত, সংস্কৃতি তাই সংযোগ ও সমন্বয় সম্ভব হতে পেরেছিল। পাশাপাশি দুটি জড়পদার্থের পারস্পরিক মিলন ঘটে না। এই প্রাচীন দেশে শতসহস্র বৎসর আগে মানবাত্মার যে অভিযান সুরু হয়েছিল তার চলা আজও থামে নাই। ভারতীয় সংস্কৃতি প্রথম যুগে গভীর পরিবর্ত্তনের মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। যখন উন্নত বৈদেশিক সংস্কৃতির সঙ্গের সংস্পর্শ ঘটেছে এ তাকে আত্মস্থ করেছে, এবং ফলে নিজে আরো বেশি সমৃদ্ধ হয়েছে। সেই প্রক্রিয়ার আজও পরিসমাপ্তি ঘটে নাই। স্থান ও কালের ব্যবধান যতোই সঙ্কুচিত হয়ে আসবে মানবমনের কীর্ত্তি আরো বেশি সমুজ্জ্বল হয়ে উঠবে। এই অপরিসীম বৃদ্ধি ও নবীনত্বের ক্ষমতার মধ্যেই রয়েছে ভারতীয় সংস্কৃতির ঐক্য ও ধারাবাহিকতার গোপন রহস্য।’

Back to top button
Close