শামসুর রাহমান

শামসুর রাহমান

  • ঝড়

    ঝড়ঝঞ্ঝা নিয়ে আছি আমরা সবাই চিরদিন;কত ঘর প্রায় প্রতি বছর যায় যে উড়ে আরমাঝে-মাঝে জলোচ্ছ্বাস বসতি নিশ্চিহ্ন করে, মনেঅগণিত নরনারী, শিশু। পশুপাখি, গাছপালাধ্বংসের গহ্বরে যায়, এমনকি তৃণমূল মাটিছেড়ে শূন্যে ধায় এলোমেলো, অনন্তর মুষলেরবৃষ্টি হয়ে ঝরে অবিরত কত শত নিকেতনে।চাই না এমন ঝড়, স্বৈরাচারের মাতন আর। বরং আসুক সেই ঝড়, যার মত্ততায় পাকাফসলের ক্ষেত নয়, কলরবময় জনপদ,প্রাণিকুল নয় আর ধ্বংস হোক…

    Read More »
  • তবে কি বৃথাই আমি

    তবে কি বৃথাই আমি তোমার ইঙ্গিতে দিগ্ধিদিকঘুরেছি ধারালো শীতে, দুঃসহ গরমে এতকাল?হায় কী বিভ্রমে ম’জে দিনরাত্রি এক মজা খালসেচে সেচে দুহাতে তুলেছি কাদা নদী ভেবে ঠিক।চতুর্দিকে কৌতূহলী লোকজন ‘ধিক, তোকে ধিক’বলে উৎপীড়ক চোখ রাখে আমার ওপর, গালদিয়ে কেউ কেউ গদ্যে করে আমাকে নাকাল।যত পারে ওরা গাত্র ঝাল তুমুল মিটিয়ে নিক। আমার বলার কিছু নেই, নিঃসঙ্গ থাকব বসেঅন্তরালে, ছায়ায় ভেতর থেকে…

    Read More »
  • তাচ্ছিল্য উজিয়ে

    ‘এখানে এসে কি ভুল করলাম?’ এই প্রশ্ন তাকেচঞ্চুতে স্থাপন করে। উস্‌কো খুস্‌কো চুল, গালে দাড়িকামানোর কাটা দাগ, শার্টের কলারে এক টুকরোঘাস, যেন স্তম্ভিত টিকটিকির জিভ।এখানে আসার আগে ছিলেন নির্জন মাঠে শুয়ে। মেঠো ঘ্রাণঘিরে আছে তাকে, বুঝি উদ্ভিদের প্রাণ তার মাঝেসঞ্চারিত; কেউ তাকে আড় চোখে দ্যাখে, কেউ কেউউপেক্ষার ডগায় নাচিয়ে কিছুক্ষণ ভিন্ন দিকেনজর ফেলায়, তিনি তাচ্ছিল্য উজিয়ে বললেন,‘এসো কোণে, একা গুঞ্জনের…

    Read More »
  • তুমি

    কিয়দ্দূরে ইঁদারার কাছে দেখি একটি তরুণীপেয়ারা গাছের পাতা ছোঁয় মমতায়,তার শরীরের চমকিতমুদ্রায় তোমার উপস্থিতি ভেবে কাছে যাই; ভুল ভেঙে যায়। একটি মেয়েকে দেখি রেস্তোরাঁয় বসে আছে একা;কফির পেয়ালা শূন্য, দু’টি হাত টেবিলে স্থাপিত।তাকে তুমি ভেবে প্রায় বলে ফেলি, ‘ভীষণ লজ্জিত, কতক্ষণবসে আছো?’ নিজের বিভ্রমে লজ্জা পাই। একদিন মফস্বলী ইস্টিশানে কুয়াশার রাতেওয়েটিং রুমে তুমি বসে আছো বিষণ্ন, সুন্দর।কোথায় চলেছ, কত দূরে?…

    Read More »
  • তৃতীয় পক্ষ

    রক্তচক্ষু রাম বলে রহিমকে, ‘এই দ্যাখ আমার রামদা,তোকে বলি দেবো’রহিম পাকিয়ে চোখ বলে রামকে, ‘বেদ্বীন, এইতলোয়ার দিকে তোকে টুক্‌রো টুক্‌রো করেকুত্তাকে খাওয়াবো’। অনন্তররামদা এবং তলোয়ারে কী ভীষণ ঠোকাঠুকি। একজন প্রশান্ত মানুষ, অস্ত্রহীন, ছুটে এসে দাঁড়লেনদু’জনের মাঝখানে, কণ্ঠে তার অনাবিল মৈত্রীর দোহাই।দু’দিকেই দুই অস্ত্র দ্বিধাহীন হানে তাকে। নির্মল, নির্বাকআসমান দ্যাখে রক্তধারা বয়ে যায় চৌরাস্তায়।    (আকাশ আসবে নেমে কাব্যগ্রন্থ)

    Read More »
  • তোমার নাম এক বিপ্লব

    আগুনে-পোড়া তরঙ্গের মতো আমার স্বপ্নগুলোকেগোছানোর ব্যগ্রতায় অধিকএলোমেলো করে ফেলি। আমার স্বপ্নগুলোকেযারা পুড়িয়ে দিয়েছে, তাদের আস্তানায়আজ মোচ্ছব। আমি আমার আর্তনাদকেমেঘের দিকে ছুঁড়ে দিয়েআগুন রঙের গুচ্ছ গুচ্ছ কৃষ্ণচূড়ার মধ্যেমুখ লুকাই। এক সম্পাহ ধরে লেখা কয়েকটি কবিতারপাণ্ডুলিপি ছিঁড়ে ফিপ্‌সিহাওয়ায় উড়িয়ে দিই; আমার মুখমণ্ডলেলেগে-থাকা কৃষ্ণচূড়ার ভগ্নাংশসমূহআমাকে কোনো আদিবাসীরআদল দেয়। ক্রোধআমার হৃদয়কে ক্রমাগত পোড়াতে থাকে আরআমি দিগন্তে দেখি তোমার মুখের উদ্‌ভাসন। আজ জানালার খুব কাছে…

    Read More »
  • দোদুল্যমান

    সে বসেছিল তার প্রশস্ত বারান্দায়শরীরে যৌবনের গোধূলি নিয়ে। আমি,বার্ধক্যের দোরগোড়া-পেরুনো, তার মুখোমুখিঅন্ধকারের ডানার রেশমি ছায়ায়। একটি ক্লান্ত পাখির ডানা ঝাড়ার শব্দেচিড় ধরে নিস্তব্ধতায়, হঠাৎ এক সময়মনে হলো, সে নেই এই সন্ধ্যাময় বারান্দায়,তার জায়গায় স্থাপিতপ্রসিদ্ধ কোনো ভাস্করের শিল্পিত পাথর।সেই ভাস্কর্য এবং আমার মাঝখানেদুলতে থাকে, ক্রমাগত দুলতে থাকেআমার একটি না-লেখা কবিতা।    (আকাশ আসবে নেমে কাব্যগ্রন্থ)

    Read More »
  • দ্বিতীয় পাখি

    আজ থেকে দেখব সকালসন্ধ্যা আমি মেঘেদের,পাখিদের ভেসে-যাওয়া। আবার দেখব ভালো করেকী করে গাছের পাতা, ভোরের শিশির পাতা থেকেঝরে যায়। বাগানের মৃত্তিকার পোকা মাকড়েরাকী ভাবে খুশিতে ঘোরাঘুরি করে চেনা এলাকায়,দেখে নেব। বহুকাল জঙ্গলের মাথায় চাঁদেরমুকুট দেখি নি; ঝিলে মুখ ডুবিয়ে চিত্রল কোনোহরিণের জলপান অদেখা রয়েছে কতকাল। বড় বেশি হৈ চৈ ছিল চতুর্দিকে, ছিল জামা ধরেটানাটানি আর গলা ফুলিয়ে বাক্যের ফুলঝুরিতাৎপর্যহীনভাবে ছোটানো,…

    Read More »
  • ধোঁয়াশায়

    এইমাত্র কবিতার মনোহর বাড়ি থেকে একলা, উদাসবেরিয়ে এলেন তিনি। কিয়দ্দুরে আড়ালে দাঁড়িয়েঘন ঘন ফুঁকছেন সিগারেট; ধোঁয়াঘিরে ধরে তাকে, কাছে ধারেতরুণ কবিরা নেই, কেউ নেই, কোথাও গুঞ্জন নেই কোনো;তিনি একা, আজ বড় একা, দুঃখের কাফনে মোড়া। একদা ছিলেন মিছিলের প্রথম কাতারে, মুখেফুটতো শ্লোগান স্ফূলিঙ্গের মতো, যেননিজেই পতাকা, এরকম উড়তেন জনারণ্যে কী সুন্দর।অধুনা বিবরবাসী, অন্য কাউকেইনয়, নিজেকেই বেশি দ্যাখেন চৌদিকে। জপতপআছে বটে,…

    Read More »
  • নব্য মানবের স্তব

    অন্ধকার ঘোর অন্ধকার উবু হয়ে বসে আছেহতাশার কোলে, ধসে-যাওয়া ঘরবাড়িভাঙাচোরা থামগুলি দুঃস্বপ্নের স্মৃতিনিয়ে অবনত, মধ্যরাতে এমিয়ার কপোতেরাএক সঙ্গে আর্তনাদ করে।য়ূরোপের আত্মাহিম শীত নেমে আসে হা-হা স্বরেএমিয়ার ঘরে ঘরে, খানিক উত্তাপসকলের প্রার্থনার প্রধান প্রস্তাব, মৃত্যু অন্তরালে হাসেবাঁকা হাসি; জানেতরুপের তাস তার হাতেই গচ্ছিত। গ্রন্থপাঠ,সমাজের যাবতীয় রীতিনীতি বেবাক অসার। সর্বনাশগ্রাস করে দশদিক, সর্পাহত অক্ষর সাজায়। ভ্রান্তি পথপ্রদর্শক জেসে খুব দ্রুত হেঁটে যায়,অনুসারীগণ…

    Read More »
Back to top button
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker